তারেক শামসুর রেহমানের তালেবান থেকে আজকের তালেবান

0
1584

ড. তারেক শামসুর রেহমান এর বহুল পঠিত বিশ্ব রাজনীতির ১০০ বছর  বইয়ে তিনি তালেবানকে যেভাবে মূল্যায়ণ করেছিলেন, সেটি পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হল-

তালেবান রাজনীতি

বিংশ শতাব্দীতে একটি উল্লেখযােগ্য ঘটনা হলাে, আফগানিস্তানে কট্টর ইসলামপন্থীদের উত্থান ও সেখানকার রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল। ‘তালেবান’ নামে ব্যাপক পরিচিতি পাওয়া ধর্মান্ধ একটি গােষ্ঠী ১৯৯৬ সালে কাবুলের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিল। এরা ছিল ধর্মীয়ভাবে অত্যন্ত কট্টর ও আফগানিস্তানে মধ্যযুগীয় ইসলামি শাসন প্রবর্তন করেছিল। যদিও এদের শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ইঙ্গ-মার্কিন বিমান হামলা ও যুক্তরাষট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর আফগানিস্তান দখল করার মধ্যে দিয়ে তালেবান শাসনের পতন ঘটেছিল। ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে সাবেক সােভিয়েত ইউনিয়ন দেশটি দখল করে নিয়েছিল। এর ঠিক ২২ বছর পর ২০০১ সালের অক্টোবরে দেশটি দখল করে নিল যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৭৯ সালে কাবুলে বারবাক কারমালকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল সাবেক সােভিয়েত ইউনিয়ন। আর ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র কাবুলের ক্ষমতায় বসিয়েছে হামিদ কারজাইকে। আফগানিস্তানে প্রভাববলয় বিস্তারের ক্ষেত্রে বৃহৎশক্তির স্ট্রোটেজির কোনাে পার্থক্য নেই। তবে তালেবানদের সেখান থেকে উৎখাত করা গেলেও, ২০০৬-২০০৭ সালে তারা আবার সক্রিয় হয়েছে। তারা নতুন করে আফগানিস্তানে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেছে।

আফগানিস্তানে তালেবানদের উত্থান মাত্র কয়েক বছরের কথা। ১৯৯৬ সালের শেষের দিকে আফগানিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমে কান্দাহারের কাশাক নাখুদ নামক স্থানে জনা ত্রিশেক আফগান একত্র হয়। মুজাহিদদের উপদলীয় লড়াই, দেশব্যাপী রক্তপাত, ধ্বংসযজ্ঞ ও অরাজকতার পরিপ্রেক্ষিতে কী করা যায় তা নিয়ে আলােচনায় বসে তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, যুদ্ধের অভিশাপ থেকে অসহায় ও বিপর্যস্ত দেশবাসীকে রক্ষা করার জন্য একটি অভিযান শুরু করতে হবে। আফগানিস্তানে এরাই তালেবান নামে পরিচিত। তালেবান’ হচ্ছে পশৃতু শব্দ যার অর্থ ছাত্র। উর্দু শব্দ ‘তালিব ইলম’-এর সঙ্গে এর মিল আছে। শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ যাই হােক না কেন, ‘তালেবান বলতে মাদ্রাসা বা ধর্মীয় স্কুলের ছাত্রদেরকে বুঝায়। তালেবানরা মূলত সমাজের দরিদ্রতম অংশ। যুদ্ধের কারণে স্বদেশ থেকে উৎপাটিত, ভিটামাটিচ্যুত, অর্থনৈতিক দুর্দশায় ক্লিষ্ট এ তালেবানদের অনকেই ছিল এতিম।

তালেবান বাহিনী মূলত মাদ্রাসার ছাত্রদের নিয়েই গঠিত হয়েছিল। মাদ্রাসার ছাত্রদের সিংহভাগই আফগান। এদের অধিকাংশই পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানের মাদ্রাসায় শিক্ষাপ্রাপ্ত। এ সকল মাদ্রাসায় এরা বিনাপয়সায় অন্ন, বস্ত্ৰ ও বাসস্থান পায়। এরা দেওবন্দী চিত্তাধারার অনুসারী। অনেকে আহলে হাদিস ও বেরেলভী মাদ্রাসায়ও পড়াশুনা করেছে। অর্থনৈতিক কারণে ও জেহাদের প্রেরণায় তরুণ আফগানরা আশির দশকে এসব মাদ্রাসায় ঠাই নেয়। সােভিয়েত ইউনিয়ন বিরােধী যুদ্ধে অংশ নেয়া অনেক যুবক সেনাবাহিনী ও বিভিন্ন সংগঠন থেকে পালিয়ে আসা লোকজনও তালেবানদের সাথে ছিল। তালেবানরা বলতে গেলে প্রায় সবাই পশৃতু ও সুন্নি এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত ও অধিকৃত এলাকাগুলো ছিল সবই পশৃতু এলাকায়।

তালেবানরা ব্যাপক আফগান জনগণের সমর্থন আদায় করতে পেরেছিল। আফগান সংকট নিরসনে যুদ্ধোন্মাদ নেতাদের বাগে আনার জন্যই এরা তৈরি হয়েছিল । শুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের মতো দুর্ধর্ষ যোদ্ধাকেও বিনালড়াইয়ে পশ্চাৎপসারণের ব্যাপারে বিস্ময়কর সাফল্য এরা অর্জন করেছিল। অভিযোগ ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার তত্ত্বাবধানে তালেবানদের প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। তালেবানরা নবাগত ছিল না। এদের অনেকেই
বিভিন্ন মুজাহিদ সংগঠন থেকে রুশ ও কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে লড়েছিল। এ বাহিনীর সুত্বীম কমান্ডার মৌলভী ওমর নিজেও ছিলেন “হরকত ইনকিলাব-ই-ইসলামি’র কমান্ডার । তালেবানরা রাতের বেলা লড়াই করত এবং প্রায়শই সম্মুখ আক্রমণ চালাত। তালেবান যোদ্ধাদের ভাষায়, “আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে ঝাপিয়ে পড়ি এবং শত্রুকে পর্যুদস্ত না করা পর্যন্ত তরঙ্গের পর তরঙ্গ আকারে এগিয়ে যাই।” তালেবান বাহিনী ছিল অস্ত্র এবং গোলাবারুদে
স্বয়ংসম্পূর্ণ । এদের কাছে বিমান, ট্যাংক ধ্বংসকারী স্টিপ্রার ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান ও ট্যাংক বিধ্বংসী কামান, মাল্টিব্যারেল রকেট লাঞ্চার ও সকল শ্রেণীর মাইন ছাড়াও গোলাবারুদের বিশাল ভাণ্তার ছিল। তালেবান আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল তালেবান শুরা। এই শুরার সদস্য সংখ্যা ছিল ৩০। শুরার সর্বশেষ প্রধান ছিলেন মৌলভী মোহাম্মদ ওমর এই সংগঠনটির দুই নাম্বার ব্যক্তি ছিলেন মৌলভী মোহাম্মদ রব্বানী। তালেবান বাহিনীর সদরদপ্তর ছিল কান্দাহারে। আধুনিক আফগানিস্তানের প্রথম রাজধানী ছিল কান্দাহার। কান্দাহার হচ্ছে মুক্তিকামী ও জাতীয়তাবাদী আফগানদের কেন্দ্রভুমি। এই নগরী জরুরি অবস্থায় আফগানদের নেতৃতু দেবার জন্যে সুপরিচিত বলে তালেবানরা এটিকে সদর দফতর হিসেবে বেছে নিয়েছিল।

সমাজতত্বিদরা মনে করেন, একটি জাতি সরকারের কাছ থেকে প্রথম যা চায় তা হলো নিরাপত্তা। এরপর তারা দাবি করে কল্যাণ। পরিশেষে চায় উন্নয়ন ও মুক্তি। সোভিয়েত সৈন্যদের আফগানিস্তান ত্যাগের পর তুমুল গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় দেশজুড়ে নিরাপত্তাহীনতা তীব্র হয়ে ওঠে। এ সময় ধর্মপ্রাণ তালেবানরা নিরক্ত্রীকরণের কৌশল নিয়ে এগিয়ে আসে । তারা নিজেদেরকে শান্তির দূত হিসেবে প্রচার করল। খুব দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে উঠল তারা। অন্য কোনো গোষ্ঠী আফগানিস্তানের শাসনভার কব্জা‌ করতে ব্যর্থ হবার মূল কারণ তারা যুদ্ধ আর নিরাপত্তাহীনতা ছাড়া আর কিছু দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে পারেনি।

১৯৯২ সালের ৩০ ডিসেম্বর আফগানিস্তানে বিভিন্ন মুজাহিদিন গ্রুপগুলোর মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছিল তাতে দুই বছরের জন্য বুরহানুদ্দিন রব্বানী প্রেসিডেন্ট ও গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করা হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পরই প্রেসিডেন্ট মন্ত্রীসভা ভেঙে দেন। এ পর্যায়ে রব্বানী ও হেকমতিয়ারের মধ্যে বিরোধ চরমে উঠেছিল। অস্ত্রের ভাষায় তারা কথা বলতে শুরু করেন। ফলে ১৯৯৩ এর জানুয়ারি থেকেই সংঘর্ষ শুরু হয়। ওই সময় সৌদি বাদশাহ ফাহাদ শান্তি আলোচনার প্রস্তাব দেন। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের উদ্যোগ এবং ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় ১৯৯৩ সালের জুন মাসে আফগানিস্তানের বিবদমান গ্রুপগুলোর নেতৃবৃন্দ এক শান্তিচুক্তিতে স্থাক্ষর করেন। তবে ওই সম্মেলনে শান্তির পক্ষের সকল
জটিলতার নিরসন হয়নি। প্রেসিডেন্ট বুরহানুদ্দিন রাব্বানী এবং প্রধানমন্ত্রী গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার একে অন্যের জানী দুশমনে পরিণত হন। আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষের দুদর্শা ওঠে চরমে । হেকমতিয়ার এবং রাব্বানীর একররে সহাবস্থান ক্রমেই অসম্ভব হয়ে ওঠে । সেখানে অনেক বড় করে দেখা দেয় সংকীর্ণ গোত্রীয় এবং আঞ্চলিকতার সংঘাত।

এই প্রেক্ষাপটেই “তালেবান’দের উত্থান ঘটে! ১৯৯৫ এর মাঝামাঝি সময়েই আফগানিস্তানের ৩০টি প্রদেশের মধ্যে ১৪টির নিয়ন্ত্রণ তালেবানদের হাতে চলে যায়। ১৯৯৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তালেবানরা পশ্চিমাঞ্চলীয় গুরুতৃপূর্ণ শহর হেরাত দখল করে সরকারের ১৭তম সেনা ডিভিশনকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ক্রমশই তালেবানদের প্রভাব প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৯৬ এর সেপ্টেম্বরে তালেবান বাহিনী কাবুল আক্রমণকরে। ওই বাহিনীর আক্রমণের মুখে বুরহানুদ্দিন রব্বানীর মুজাহিদীন সরকার কাবুলছাড়তে বাধ্য হয়। তালেবান গোষ্ঠী কাবুল দখল করার পরপরই সরকার গঠন করে এবং দেশে কঠোর শরিয়া আইন জারি করে। এরপর তালেবান কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন দেশের স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা করে। কিন্তু একমাত্র পাকিস্তান ছাড়া তাৎক্ষণিকতাবে অন্য আর কোনো
দেশের স্বীকৃতি আদায়ে ব্যর্থ হয়। পরে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতও স্বীকৃতি দেয়। পাকিস্তানি সশস্ত্রবাহিনী তালেবান সরকারের প্রতি অকুষ্ঠ সমর্থন জানার । ১৯৯৬ সালের শেষ নাগাদ সম আফগানিস্তানের ৯৫ ভাগ এলাকা তালেবানদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে ! উত্তরাঞ্চলের মাত্র ৫ ভাগ এলাকা কেবল নিরোধী জোটের নিয়ন্তণে থাকে। তালেবানদের দ্রুত উত্থানের নেপথ্য নায়ক হিসেবে গুরুত্পূর্ণ অবদান রাখেন আমীর
উল-মুমেনীন মোল্লা মোহাম্মদ ওমর। বয়স আনুমানিক চল্লিশ । সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় তিনি এক চোখ হারান। তিনি তালেবান সদরদফতর দক্ষিণাঞ্চলীয় কান্দাহার নগরীতে বসবাস করতেন। প্রকাশ্যে খুব কমই আসতেন তিনি। তালেবানদের দ্রুত উত্থানের পিছনে একটি বিষয় টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করে। ১৯৯৪ সালের শেষভাগে ইসলামাবাদ সরকার পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে মধ্য-এশীয়ায় (সাবেক সোভিয়েত মধ্য-এশীয় প্রজাতন্ত্র তাজাকিস্তান, উজবেকিস্তান, তুক্কমেনিস্তান) নতুন বাণিজ্যিক রুট খোলার ঘোষণা দেবার পরপরই তালেবানরা সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে। ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরে তালেবানদের নাটকীয় উথানের পর তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় মেয়েদের কঠোরভাবে পর্দা মানতে বাধ্য করা হয়। নারী শিক্ষার প্রসারে তারা মোটেও উৎসাহী ছিল না। কান্দাহার ও অন্যান্য নগরীতে একদল তালেবান কীচি হাতে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াত এবং লম্বা চুলওয়ালা যুবকদের পেলেই তাদের চুল ছেঁটে দিত। তাদের বক্তব্য চালচলন, বেশবাস, চোহারা সবকিছুই শরিয়তসম্মত ছিল। তালেবানদের এলাকায় ফুটবল, ভলিবল, কারাতে, দাবা প্রভৃতি নিষিদ্ধ ছিল। জীবন্তকোনো কিছুর ছবি তোলা তারা সমর্থন করত না। তাদের এলাকায় ইসলামি আদালত ছিল। অপরাধ অনুযায়ী হাত, পা কেটে ফেলার মতো ব্যবস্থাও ছিল। তালেবানরা প্রথমবাস্থায় বেশ কম সময়ের মধ্যে তাদের এলাকায় নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনলেও পরবর্তীকালে তারা আফগানিস্তানের সার্বিক অবস্থাকে তছনছ করে দেয়। তাদের হাতে ছিল সর্বাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র। তালেবানদের মধ্যে সামরিক শিক্ষায় শিক্ষিত ২৫ হাজার সক্রিয় সদস্যও ছিল। তারা আফগানিস্তানে নতুন সম্যা সৃষ্টি করে শান্তির পথে নতুন করে কীটা বিছিয়ে দিয়েছিল । চরদখলের মতো এলাকা দখল, পুনর্দখলের মাধ্যমে তারা আফগানিস্তানের ৯৫ শতাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছিল।

তালেবানদের উত্থানের পর তারা প্রায় পাচ বছর শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল। ওই সময় তারা আফগানিস্তানের চেহারা খোলনলচে সমূলে পাল্টে ফেলে। প্রাক্তন তালেবান নেতা সাইয়ীদ রাহমাতুল্লাহ নাশেমীর মতে

তালেবানদের প্রধান অর্জনসমূহ ছিল নিম্নরূপ:

১. তালেবানরা খণ্ড-বিখণ্ড আফগানিস্তানকে একত্র করে। আফগানিস্তান আগে পাচ ভগ্নাংশে খণ্ডিত ছিল। তালেবানরা একে জোড়া লাগায় এমন সময়ে যখন এ কাজ আর কেউ করেনি।

২. তালেবানরা আফগান জনগণকে নিরস্ত্র করে। যুদ্ধের পর প্রতিটি আফগানের কাছে একটা কালাশনিকভ রাইফেল ছিল। এমনকি তাদের নিয়ন্ত্রণে ওই সময় ফাইটার প্লেন এবং ফাইটার হেলিকপ্টার ছিল। এই লোকগুলোকে নিরস্ত্র করার দুরূহ দায়িত্ব তালেবানরা পালন করে।

৩. তালেবানরা আফগানিস্তানে একটি একক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করে যা এর পূর্বে ১০ বছর ধরে সেখানে ছিল না।

৪. একসময় আফগানিস্তান বিশ্বের ৭৫ শতাংশ আফিম উৎপাদন করত। তালেবানরা বিশ্বের আফিম
চাষের ৭৫ শতাংশ কমিয়ে আনে।

৫. তালেবানরা মানুষকে একটি নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা দেয়। এছাড়া তারা সকল আফগানের জন্য অভিন্ন বিচারব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ নেয়।

কিন্তু এসব সত্তেও তালেবানরা তাদের পতন রোধ করতে পারেনি। ২০০১ সালের অক্টোবর তাদের চূড়ান্ত পতন ঘটে। তালেবানদের পতনের কারণগুলো পর্যালোচনা করতে গেলে আমরা মূলত যে সকল কারণ খুঁজে পাই তা নিয়ে আলোচনা করা হলো

১. তালেবানরা নিজেদেরকে ইসলামি আদর্শে অনুপ্রাণিত বলে দাবি করে। কিন্তু তাদের কেউ কেউ ছিল ধর্মনিরপেক্ষ । ফলে তাদের পক্ষে যে আফগানিস্তানে এক্যবদ্ধ ইসলামি সরকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়-এ ব্যাপারে সাধারণ আফগানরা সন্দিহান হয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে তালেবান সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে পরিচালিত অভিযানের সময় সাধারণ আফগানদের অধিকাংশের সমর্থনই তালেবান সরকারের পেছনে ছিল না।

২. তারা এমন একটি সংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মীয় গ্রুপ ছিল যারা ছবি তোলায়ও আপত্তি করে। তাদের
মাত্রাতিরিক্ত সংস্কারাচ্ছন্নতা তাদের পতনকে ত্রান্থিত করে।

৩. ১১ সেপ্টেম্বর, ২০০১- এর টুইন টাওয়ার ট্রাজেডি তালেবানদের পতনের মূলে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে
কাজ করে। আমেরিকানরা টুইন টাওয়ার হামলার মূলে “আল কায়েদা নেটওয়ার্ক”-কে প্রত্যক্ষভাবে দায়ী বলে সন্দেহ করে। আর আল-কায়েদা নেটওয়ার্কের সাথে তালেবানদের সরাসরি সম্পৃক্ততার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। হামলাকারীদের নেতৃত্বে ছিল ওসামা বিন লাদেন। তাকে আশ্রয় দিয়েছিল তালেবান শাসিত আফগানিস্তান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের উপর এই হামলাকে “সভ্যতার উপর আক্রমণ’ বলে আখ্যায়িত করে। তারা হামলাকারীদের মদদদাতা হিসেবে তালেবানদের চিহ্নিত করে এবং তাদেরকে সমূলে উৎপাটনের লক্ষ্যে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। ফলে তালেবানদের পতন তরান্বিত হয়।

৪. আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণের দোহাই দিয়ে ই- মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তানে যে অভিযান পরিচালনা করে তার মূলকারণ হিসেবে আফগানিস্তানে শাস্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়। প্রকারস্তরে মার্কিন স্থার্থরক্ষা
করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। এতে করে তালেবানরা তাদের একসময়কার মদদদাতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোপানলে পড়ে এবং তাদের পতন ঘটে।

৫. ধর্মীয় বিধিবিধান ও শারিয়া শাসন প্রতিষ্ঠার দোহাই দিয়ে তালেবানরা সমগ্র আফগানিস্তানের জনগণের উপর যে বাধ্যতামূলক, জবরদস্তিমূলক কালাকানুন ও গৌঁড়ামিপূর্ণ বিধিবিধানসমূহ চাপিয়ে দেয় আফগান জনগণ সেসব মন থেকে মেনে দিতে পারেনি। ফলে, দেশে তালেবান সরকারের পায়ের তলার মাটি দিনকে দিন সরে যেতে থাকে। বহির্বিশ্ব তালেবানদের জবরদস্তিমূলক কর্মকাণ্ডে সমর্থন জোগায়নি। তারাও তালেবান সরকারের গদি রক্ষার্থে এগিয়ে আসেনি । ফলে, দেশে-বিদেশে ব্যাপক গণরোষ তালেবান সরকারের পতনকে ত্বরান্বিত করে।

৬. শাসনকার্যে পূর্বের অনভিজ্ঞতা ও অদক্ষতা এবং নেতৃত্বের শূন্যতা তালেবানদের পতনের অন্যতম গুরুতৃপূর্ণ কারণ হিসেবে কাজ করেছিল বলে মনে করা হয়।

৭. টুইন টাওয়ার ট্রাজেডির পর বুশ প্রশাসন এক পর্যায়ে বিন লাদেনকে হস্তান্তরের বিনিময়ে তালেবান কর্তৃপক্ষকে রাজনৈতিক স্বীকৃতি ও অর্থনৈতিক সাহায্য প্রদান নিয়েও দরকষাকষি করেছিল । ওই সময় বুশ প্রশাসন থেকে বলা হয়, “আমাদের সোনার কার্পেটের প্রস্তাবটি মেনে নাও আর নয়তো বোমার কার্পেটের নিচে তোমাদের কবর রচিত হবে।” পরবর্তীকালে মার্কিনীদের এ হুমকি সত্য হয়ে দেখা দেয় এবং
তালেবানদের পতন ঘটে।

উপসংহার

আফগানিস্তানের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হচ্ছে তালেবানদের শাসন। আফগানিস্তান বারবার আক্রান্ত হয়েছে। হামিদ কারজাই-এর নেতৃত্বে সেখানে বর্তমানে একটি সরকার গঠিত হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ সেখানে পরিপূর্ণভাবে বন্ধ হয়েছে, এটা বলা যাবে না। বিচ্ছিন্রভাবে হলেও তালেবানরা সেখানে তাদের তৎপরতা চালাচ্ছে। সেখানে ইঙ্গ-মার্কিন বাহিনী ও ন্যাটোর বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু তারা সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে, তা বলা যাবে না। একটি রাজনৈতিক কাঠামোর সেখানে জন্ম হয়েছে সত্য, কিন্ত তা আফগানজাতিকে একত্র করতে পারেনি । স্পষ্টতই হামিদ কারজাই সরকার আফগানিস্তানের সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ইতোমধ্যে তিনি তালেবানদের সাথে ‘সংলাপ’-এর ডাক দিয়েছেন। সুতরাং একুশ শতকে আফগানিস্তান যে আলোচনায় থাকবে, তা বলাই বাহুল্য ।

সহায়ক গ্রস্থাবলি

১. তারেক শামসুর রেহমান, নয়া বিশ্বব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি, ঢাকা, ২০০২

২. তারেক শামসুর রেহমান, বিশ্বরাজনীতির চালচিত্র, ঢাকা ২০০৬

৩. ইকবাল কবীর মোহন, মুসলিম বিশ্বে আগ্রাসন, ঢাকা, ২০০৪

 

ড. তারেক শামসুর রেহমান : প্রফেসর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

পূর্ববর্তী নিবন্ধঝিনাইদহে ১২৩ ফুট উচ্চতায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য
পরবর্তী নিবন্ধতালেবান নিয়ন্ত্রণের পর কাবুলে বাড়লো বোরকা বিক্রি

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে