ক্যানিবালিজমের অব্যর্থ চক্র | সৌরভ তাবরিজি

1
330

তখন দ্বিপ্রহর।
জীবন সায়াহ্নে এক মুমূর্ষুর মতো
আমি বলছি তোমায় এক ভূয়োদর্শনের কথা।
যেখানে জ্বলন্ত সূর্যের দিকে তাকিয়ে এক নিষ্প্রভ দৃষ্টি
বারবার ফিরে আসে দুফোঁটা জল হয়ে।

এভাবে কত না-পাওয়া জমেছে, কত ইচ্ছে-পূরণ থেমেছে,
কত রমণীয়, কমনীয়, পার্থিব পণ্যবীথিকার পসার সাজাতে গিয়ে
নিজেই হয়েছি পণ্যের মতো।

আজ তুমি যে সংসার খেলার আয়োজন করো, আর ভাবো-
জয়ের স্মারক চিহ্ন শোভা পাবে কাঁচে, পাইরেক্স বাক্সে,
আমি সে সংসার খেলায় শতধা বহু-বিভক্ত কাঁচের টুকরোয়
অনন্ত বিঁধেছি কোনো ছড়ানো কাঁটার আলিঙ্গনে ।

এখানে মানুষ খুবলে খায় মানুষকে,
দুধ খাওয়ানোর অব্যবহিত আগে মা তার স্তনে মাখিয়ে রাখে বিষ।
আর যাকে পরম শ্রদ্ধাভাজন পিতা বলে তুমি অবনত হও,
মাংস শ্রমিক পরিচয় দিয়ে সেও বসে থাকে কসাইখানা খুলে।

ক্যানিবালিজমের অব্যর্থ চক্র এখানে মনে করিয়ে দেয়,
মরণ-সন্ধিক্ষণ অন্তত বেঁচে থাকার চেয়ে ভালো।
কিংবা, মৃত্যু ভালো জীবনের চেয়ে।
কেননা, পোকারাই মানুষখেকো,
মানুষ কখনও কবরের মানুষকে ছোঁয় না, গিলে না।

খেলা থামিয়ে আমি শয্যাশায়ী হলাম।
বাঁচা মরার দ্বন্দ্ব যখন চরমে, তখন- মনে হয়,
টাইব্রেকারে মৃত্যুর জিতে যাওয়াই হবে আমার পরম মুক্তি।

জিতে যাওয়া-হেরে যাওয়ার গল্প তোমায় শুনিয়ে কী এমন হবে?
আমার পুরো জীবন হেরে যাওয়ার, হেরে যাওয়া সেই শিশুর মতো
খেলা যাকে আপন ভাই বলে পরিচয় দেয়নি,
আর তাই সে মন খারাপ করে বসেছিলো
আস্ত একটা খেলার মাঠ কিনে নেবে বলে স্বপ্ন দেখেছিলো,
অথচ শৈশব ঘুম ভাঙতেই সে বুঝেছিল- পৃথিবীতে কোনো মাঠ নেই।

পুরোনো সেই নদীতে মাছ ধরতে নেমেছিল তারই মতো অবুঝ শিশু।
দুহাতের তালুতে গড়া আঁজলা ছোট বলে, মাছের নাগাল পায়নি সে।
দৈহিক বৃদ্ধির সমানুপাতিক হারে তার হাত বড় হতেই
মাছেরা বাসযোগ্য পানি ছেড়ে আকাশের ছোট্ট ঘরে বাসা ভাড়া নিলো,
আর জলের পাশে বসা বয়োঃপ্রাপ্ত শিশুটির মাছের সাথে গল্প করা হলো না।

খোলা জানালায় এক ভ্যাপসা বাতাস, তীর্যক সূর্যরশ্মি
কেবলই মনে পড়ছে সেই তীর্যক, বিষণ্ন দিনের কথা,
যেখানে প্রথম প্রেমিকার হাতে হাত রাখতেই
কামারের হাপরের মতো বেরুতো উত্তাপ,
কিংবা জীবন ছিল প্রখর উত্তাপে ক্লিষ্ট।

তুমি যখন এই শহরের কোনো ফেরিওয়ালাকে রঙিন ফিতে বিক্রি করতে দেখো,
তখন আমি দিব্য চোখে দেখি- কোন সাপুড়ের মতো
হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালা বিন হাতে চলেছে আগুনের শহরে।
আর কতক রমনী, বৃদ্ধ, বনিতা, আবাল সাপের মতো অনুসরণ করছে সে বাঁশির।

কিংবা উঁচু মঞ্চে দাঁড়ানো সুশ্রীর যে ভাষণে তুমি মোমের মতো গলছিলে,
আমি সেখানে দেখেছি সাকুরাজিমা আগ্নেয়গিরির লাভা পুড়িয়ে দিচ্ছে সব।
বের হয়ে আসছে- ভূগর্ভস্থ ম্যাগমা চেম্বারের জ্বলন্ত ক্ষোভ।

তুমি ভেবো না মুমূর্ষু বকছে প্রলাপ,
বরং থিতু হও; ফলবান বৃক্ষই কেবল নুয়ে থাকে।
আমার গুটিয়ে যাওয়া অবসন্ন শরীরে বলছি,
তুমিও সঙ্গী হও আমার মৃত্যুযাত্রায়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআল-জাজিরা, খালেদ মুহিউদ্দীন ও নাইমুল ইসলাম খান।
পরবর্তী নিবন্ধসীরাতে রাসুলের (স) ব্যাপক প্রচারে আস সুন্নাহ ফাউন্ডেশন

1 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে