হ্যাশট্যাগের ব্যবহার, ফিলিস্তিনকে সহযোগিতা ও ভেরি-কুল বাঙালির দ্বিধা-আয়োজন

0
368

ফিলিস্তিনে চলমান ইসরাইলী সহিংসতা নিয়ে দেশে দেশে জনমত-গঠন চলছে। এই জনমত গঠনের বিষয়টি আসলে কী? একাত্তরে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ হয়েছিল বিখ্যাত ম্যাডিসন স্কয়ারে। বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, জর্জ হ্যারিসন, বিলি প্রিস্টন, লিয়ন রাসেলের সেই কনসার্টের টাকা কোথায় গেলো? বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কি সেই টাকা আসলেই কাজে লেগেছিল?

ইউনিসেফকে দিয়ে সেই টাকা শরনার্থীদের সাহায্যের জন্য ব্যবহারের একটি চেকও পাওয়া যায়। আবার এমনও অভিযোগ আছে, এখান থেকে গঠিত তহবিলের টাকা চুরি হয়েছে। George Lennon মনে করতেন, এই টাকা পুরোটাই খোয়া গেছে। তিনি একটা সাক্ষাৎকারে এ ব্যাপারে জানিয়েছিলেন, I can’t even talk about it, because it’s still a problem. You’ll have to check with Mother [Yoko], because she knows the ins and outs of it, I don’t. But it’s all a rip-off.

আমরা যদি প্রাপ্ত টাকার কোনো খোঁজ না-ও পাই, তারপরও বলতে পারি এই কনসার্ট আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাথে অঙ্গীভূত এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সাথে বিশেষভাবে জড়িত। সে সময় দেশের বাইরে ৪০,০০০ দর্শকের উপস্থিতিতে একটা কনসার্টের আয়োজন এবং সেখানে বাংলাদেশে গণহত্যার স্বরূপ বিম্বিত করা মোটেও মামুলি কাজ নয়। বরং, এটি পাকিস্তানিদের গালে চপেটাঘাত। আর এটিই জনমত, এটিই জনসাধারণের মাঝে গণহত্যার স্বরূপ বিম্বিত করার ইঙ্গিত। এরকম জনমত সৃষ্টির কাজ হয়েছিলো ব্রিটেনে। ব্রিটেনে পাকিস্তান হাইকমিশনের সামনে রাতভর আন্দোলন, বার্মিংহামে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন, ট্রাফালগার স্কয়ারে সমাবেশ সবকিছুই ছিল জনমত সৃষ্টির উদ্দেশ্যে।

প্যালেস্টাইনে যে নির্যাতন, ইসরাইলি ইহুদি দমন-পীড়ন চলছে তাতে নিঃসন্দেহে গাজাবাসীর আর্থিক সহযোগিতা ও মেডিকেল এইডের প্রয়োজন। কিন্তু, এখানেও প্রশ্ন রয়ে যায়, ফাতাহ-কেন্দ্রিক ফিলিস্তিন দূতাবাসে যদি সহযোগিতা পাঠানো হয়, তবে কি তা গাজা পর্যন্ত পৌঁছবে? কেননা গাজা হামাসের নিয়ন্ত্রণে। আর মাহমুদ আব্বাসের ফাতাহর সাথে হামাসের বিরোধ তো সবসময়ই। সম্প্রতি আল জাজিরার খবরে জানা গেছে এ সংকট নিরসনে ফাতাহ-হামাস একীভূত হয়েছে। তবে দৃশ্যমান কোনো একীকরণ আমাদের চোখে পড়েনি। তাহলে আমরা কি করতে পারি? সহযোগিতা বন্ধ করার চেয়ে সহযোগিতা গাজা পর্যন্ত পৌঁছানো নিশ্চিতের ব্যাপারে আমাদের দেশ থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো পদক্ষেপ নেয়া যায় কিনা, সে বিষয়টি বিবেচনায় আনা যেতে পেরে।

এবার হ্যাশট্যাগ প্রচারাভিযানের আলোচনায় আসা যাক। এটির কি আদতে কোনো গুরুত্ব আছে? এ প্রশ্নের উত্তরে আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে ফেসবুক, টুইটারসহ অন্যসব সোশ্যাল-মিডিয়ার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ফিরতি কি প্রতিক্রিয়া আসছে?

ইহুদি, আকসা প্রভৃতি কি-ওয়ার্ড সম্বলিত পোস্টগুলো টুইটার থেকে হাইড করে দেয়া হচ্ছে, ফেসবুক একাউন্টে ইহুদি-বিরোধী পোস্টগুলোর জন্য প্রোফাইলগুলো রেস্ট্রিকটেড বা কখনো ডিএকটিভেট করে দেয়া হচ্ছে।

প্যালেস্টাইন সংক্রান্ত সকল কন্টেন্টগুলো রিমুভ করে দেয়া হচ্ছে। এর মানে দাঁড়াচ্ছে, বিষয়টি মোটেও গুরুত্বহীন নয়। বরং একবারে চুপচাপ নিষ্ক্রিয়তার বিপরীতে এটিই হচ্ছে বিশ্বব্যাপী জনমত-সৃষ্টি। ম্যাডিসন স্কয়ারে সেই সোশ্যালমিডিয়াহীন সময়ে ৪০ হাজার জনতাকে একসাথ করে দেয়া জনমত সৃষ্টি আবার ডিজিটালাইজেশনের এ যুগে একটা বিষয়কে ট্রেন্ডিং পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারাও জনমত সৃষ্টি। কোনোটিকেই উপেক্ষা করে দেখার সুযোগ নেই।

হ্যাশট্যাগের ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ে সবচেয়ে বেশিবার ব্যবহারের ইতিহাস হলো BringBackOurGirls হ্যাশট্যাগটির। ২০১৪ সালে নাইজেরিয়ায় সন্ত্রাসী দল বোকো হারাম ২৭৬টি মেয়েকে অপহরণ করলে তাদের উদ্ধারে আন্তর্জাতিক সমর্থন পেতে চালুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ১৩০ কোটি বারের বেশি টুইট হয়েছিল। — প্রথম আলো

আবার হ্যাশট্যাগ #metoo ভারতে সবচেয়ে শক্তিশালী আলোড়ন তুলেছিলো। একে একে যৌন নিপীড়নের চিত্র প্রতিভাত হচ্ছিলো আমাদের চোখের সামনে। অনেক অপরাধীকে আমরা ক্ষমা চাইতেও দেখেছি। সবমিলিয়ে হ্যাশট্যাগকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। প্রথম আলোর ভাষ্যমতে, হ্যাশট্যাগ হলো ডিজিটাল দুনিয়ার কণ্ঠস্বর। যারা সময়কে অস্বীকার করে হ্যাশট্যাগ নিয়ে বিমুখতা ও অন্যকে কটাক্ষ করতে চায়, তারা ডিজিটালাইজেশনের পরিধির অভ্যন্তরে আসতে পারেননি।

এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভেরি কুল বাঙালিকে নিয়ে। তারা কোনো বিষয়েই একমত হতে পারেন না। হ্যাশট্যাগ আন্দোলনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে গেছেন একদল। আর হামাস-ফাতাহ দ্বন্দ্বে অনেকে সহোযোগিতা করতে গিয়ে হয়েছেন নিরুৎসাহিত। তবে আমাদের উচিত কোনো কিছুকেই অবহেলার চোখে না দেখা। ডিজিটাল আন্দোলন, বায়তুল মোকাররমের সামনে বিক্ষোভ কিংবা ফিলিস্তিন দূতাবাসে সহযোগিতা, সব কিছুরই কিছু না কিছু উপযোগিতা আছে। গ্লোবালাইজেশন আমাদেরকে সহজে একীভূত করতে পারে যেকোনো সময়। সম্প্রতি সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম আটকের ঘটনায়ও হ্যাশট্যাগ জনপ্রিয় হয়েছে, ভাষা পেয়েছে সাংবাদিক মুক্তির ডিজিটাল আয়োজন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসাংবাদিক রোজিনার জামিন শুনানি সম্পন্ন; আদেশ পরে
পরবর্তী নিবন্ধসাংবাদিক রোজিনা ইসলামের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে রাণীশংকৈলে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে