স্বামীহারা এক দেশের গল্প

0
186

কাজী হামদুল্লাহ
আজকে স্বামীহারা একটি দেশের গল্প বলার জন্য বসেছি। তবে গল্পটা শুরু করার আগে সম্প্রতি দেশের আলোচিত একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে গেলো। রাজশাহীর ফ্রিল্যান্সার আনোয়ারুল ইসলামের আত্মহত্মার ঘটনা আমরা কমবেশি সকলেই জানি। দেশে মূলধারার প্রায় সব গণমাধ্যমে সে সংবাদ এসেছে। ঘটনার ভেতরের ঘটনা জানতে ফেস দ্যা পিপলের সাইফুর সাগর সেই ফ্রিল্যান্সারের স্ত্রী রুবি বেগমকে সামনে নিয়ে এসেছেন। গত ২ জুন রাতে লাইভে এনে তার প্রায় আধাঘণ্টার একটি ইন্টারভিউও নিয়েছেন তিনি।

লাইভে খুব বেশি কিছু স্পষ্ট না হলেও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে, বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতেই উন্নয়নশীল বাংলাদেশের এক যুবক আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। তিন সন্তানের জনক এক বেকারের গল্পই কেবল নয়, দেশে এমন হাজারও-লাখও বেকার যুবক-তরুণ রয়েছে, আজ তাদেরই একটি সমীক্ষা তুলে ধরবো। তার আগে আসুন, আনোয়ারুল ইসলাম সম্পর্কে আরেকটু জেনে আসি…।

লাইভের শুরু থেকেই ভাবছিলাম যে, এতে হয়তো অনেক তথ্য জানতে পারবো, যা অনেকেই জানেন না। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, লাইভটি দেখে আমি বরং হতাশই হয়েছি। খুব বেশি ইনফরমেশন বা তথ্য সেখান থেকে আসেনি। তবে কোন ইনফরমেশন না আসাটাই যে একটা বড় ইনফরমেশন তা বুঝতে আমার বেশ কিছুটা সময় লেগেছে।

যারা আনোয়ারুলের ফেসবুকে পোস্ট করা সুইসাইড নোটটি পড়েছেন, তারা হয়তো খেয়াল করেছেন, সে বারবার লিখেছে, তার স্ত্রী একজন সহজ-সরল নারী। ফেস দ্যা পিপলের লাইভে রুবি বেগমকে দেখে তার সেই কথাটি আমার বারবার মনে হয়েছে। আমার মনে হয়েছে কথাটি শতভাগ সত্য। লাইভে রুবির প্রতিটি কথায় সারল্য ছিলো। সাইফুর সাগর যখন তাকে প্রশ্ন করছিলেন যে, এখন কোন ব্যবস্থা নেয়ার প্রয়োজন মনে করছেন কিনা, তখন রুবির সহজ-সরল উত্তর, ‘বুঝতে পারছি না ভাই আসলে কী বলবো’।

সংশ্লিষ্ট খবর পড়ুন ‘ঘরে খাবারের কষ্ট’, রাজশাহীতে ফ্রিল্যান্সারের লাশ উদ্ধার

মানে কী দাঁড়ায় জানেন? আনোয়ারুল তার শেষ লেখাটিতে কোন ছলনা রেখে যায়নি। মনের আসল কথা এবং সত্য কথাগুলোই লিখে গেছেন। রুবি লাইভে বলেছেন, তার স্বামী ১০ বছর ধরে ফ্রিল্যান্সিংয়ের সাথে জড়িত। ফাইভার বাংলাদেশ ও আপওয়ার্ক বাংলাদেশের অনেকে তাকে চেনেন।
লাইভের একদম শুরুতে রুবি বলছিলেন, তিনমাস থেকে কাজ বন্ধ হয়ে আছে। কাজ বন্ধ থাকার জন্য আমাদের খাবারের কষ্ট হয়ে গেছে। অর্থাৎ আনোয়ারুল কাজ পাচ্ছিলেন না। যার ফলে ঘরে খাবার নেই। তার স্ত্রী এলাকার এক দোকান থেকে বাকি নিয়ে খাবারের ব্যবস্থা করতেন। কিন্তু সেই টাকাও পরিশোধ করার মতো কাজ তিনি পাচ্ছিলেন না। রুবি লাইভে বলছিলেন যে, ঈদেও তাদেরকে কোনকিছু কিনে দিতে পারেননি আনোয়ারুল।

একজন পুরুষ তার স্ত্রী-সন্তানকে খুশির রাখার জন্য যে টাকা দরকার, সে টাকার ব্যবস্থা তার ছিলো না।অর্থাৎ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হিসাব মতে দেশের ৩ কোটি বেকারের একজন ছিলেন আনোয়ারুল। বেকারত্বের কারণেই তিনি আত্মহত্যা করেছেন। লাইভের পুরোটা দেখে এতটুকু যে কেউ নিশ্চিত হতে পারবেন।

ভাবা যায়, যেই দেশের জাতীয় বাজেট প্রস্তাব হয় ৬ লাখ ৩ হাজার কোটিরও বেশি টাকা সেই দেশের এক যুবক কাজ না পেয়ে বা বেকারত্বের যন্ত্রণায় আত্মহত্যা করে!

শুধু কী আনোয়ারুল ইসলামই? তার মতো আরও লক্ষ-কোটি তরুণ-যুবকের আজ এই দশা। কেউ আত্মহত্যা করে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তির পথ খুঁজছে আর কেউ এতেই ধুঁকে ধুঁকে মরছে।

বেকারত্ব যে একটি সামাজিক ব্যাধি বা সংকট তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।বেকারত্ব একটি জাতির অভিশাপ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, বাংলাদেশের ঘাড়ে এই অভিশাপ চরমভাবে বেঁকে বসেছে। তবে সেদিকে কারই কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। সবাই কেবল নিজের আখের গোছাতেই ব্যস্ত।

আনোয়ারুল ইসলামের পোস্ট

গত জানুয়ারির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) আঞ্চলিক কর্মসংস্থান নিয়ে এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি পাকিস্তানে, যা ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। আর এ তালিকায় ২৮ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে। বাংলাদেশে এ হার ১০ দশমিক ৭ শতাংশ।

বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের হার শুনলে ‘হা’ হয়ে থাকতে হয়। প্রতি ১০০ জন স্নাতক ডিগ্রিধারীর মধ্যে ৪৭ জনই বেকার। অর্থাৎ প্রতি দুইজনে একজনের নাম বেকারের খাতায় অন্তর্ভূক্ত।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৬-১৭ এর হিসাব বলছে, দেশে কর্মক্ষম বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ। প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, দেশে শ্রমশক্তির মোট পরিমাণ ৫ কোটি ৬৭ লাখ। এর মধ্যে কাজ করছে ৫ কোটি ৫১ লাখ ৮০ হাজার জন। এর অর্থ বেকারের সংখ্যা মাত্র ২৬ লাখ ৮০ হাজার।

এখানে একটি রহস্যজনক বিষয় না বললেই নয়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর আগে ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পরপর দুই বছর ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপ করলেও এরপরে তারা শ্রমশক্তি নিয়ে নতুন জরিপ করেনি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের পরেই এটি বন্ধ হয়ে যায়। মূলত বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় একটি প্রকল্পের আওতায় পরপর দুই অর্থবছর জরিপটি করা হয়। প্রকল্পে বিদেশি সাহায্য আসা শেষ, প্রকল্পও বন্ধ। তা ছাড়া আরেকটি মুশকিলও হয়েছিল। ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে কর্মে নিয়োজিতদের সংখ্যা জানা যেত বলে একবার দেখা গেল, হঠাৎ বেকারের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। একবার মৌসুমি বেকারত্বের সেই তথ্য জানার পরপরই বন্ধ হয়ে যায় ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে শ্রমশক্তি জরিপের কাজ। কর্মসংস্থান কমে গেছে, তার চেয়ে তথ্য না জানাটাকেই হয়তো শ্রেয় মনে করছে বিবিএস।

যাই হোক, তাদের ইচ্ছা হলে তারা দেশের আসল পরিস্থিতি দেখাবে আর ইচ্ছা না হলে নাই। আমরা জনগণ এখানে কথা বলার কোন অধিকার আছে?

তবে যাদের অধিকার আছে সেই আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা ৩ কোটি। প্রতিষ্ঠানটি আভাস দিয়েছে, কয়েক বছরে তা দ্বিগুণ হয়ে ৬ কোটিতে দাঁড়াবে, যা মোট জনসংখ্যার ৩৯ দশমিক ৪০ শতাংশ হবে। আইএলওর হিসাবটিকেই পর্যবেক্ষকেরা বাংলাদেশের প্রকৃত বেকারের সংখ্যা বলে মনে করছেন।

এখন আমরা খাতা-কলম নিয়ে বসে থাকব হিসাব করার জন্য যে, কতজন আনোয়ারুল আত্মহত্যা করে আর কতজন রুবি বেকারত্বের কারণে স্বামীহারা হয়। এছাড়া আমরা আর কী-ই বা করতে পারি?

এফটিপি/কাজী হামদুল্লাহ

পূর্ববর্তী নিবন্ধঢাবিতে হামলার প্রতিবাদে এবার মশাল মিছিল ঢাকা জেলা উত্তর ছাত্রদলের
পরবর্তী নিবন্ধবাজেটের ৬১ শতাংশ সরকারি কর্মকর্তাদের; বেড়েছে বেতন ও সুদ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে