নুসরাতের সহবাসে সমাজের সর্বনাশ

0
406

কাজী হামদুল্লাহ
টালিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত জাহানের ব্যক্তিগত জীবন এখন আলোচিত টপিক। বেশ কিছুদিন থেকেই মিডিয়ার খবরে বারবার আসছে তার নাম। সেইসাথে তার ব্যক্তিগত চটকদার কিছু সংবাদও। সর্বশেষ টালিউডেরই আরেক অভিনেতা ‘যশের সন্তানের মা হচ্ছেন নুসরাত’ এমন সংবাদে আবারও তুঙ্গে ওঠে নুসরাত ইস্যু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ মিডিয়াপাড়ায় চলতে থাকে সরব আলোচনা।

সেসব আলোচনা এবং সংবাদের প্রেক্ষিতে জানা যায়, দু’জন দু’ধর্মের অনুসারী হলেও ধর্ম এবং সামাজিক রীতিনীতিকে তোয়াক্কা না করে ২০১৯ সালের জুনে তুরস্কের একটি রিসোর্টে ভারতের ব্যবসায়ী নিখিল জৈনের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন নুসরাত। এর আগের বছর নিখিলের শাড়ির ব্র্যান্ডের মডেল হয়েছিলেন নুসরাত। সেই থেকেই পরিচয় এবং পরিচয় থেকে প্রেম ও পরিণয়। দৈনিক প্রথম আলোর এক খবরে বলা হয়, অল্প দিনেই তাদের সম্পর্ক গাঢ় হয়। এরপর তাঁরা দুজনে মিলেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন।

তাদের বিয়ের সময় পুরো বিয়ের সকল সংবাদ খুব ফলাও করে প্রচারিত হয় দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে, এটা সকলেই জানেন। আবার বছর না পেরোতেই তাদের বিচ্ছেদ হয়েছিলো এটাও টালিপাড়ার ওপেন সিক্রেট। তবে এ বিষয়ে এতদিন সরাসরি মুখ না খুললেও স্ত্রী নুসরাতের সঙ্গে বিচ্ছেদের জন্য আদালতে মামলা করেন নিখিল। আগামী ২০ জুলাই সেই মামলার শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।

তুরস্কে বিয়ের আসরে নুসরাত ও নিখিল

সর্বশেষ গত ৪ জুন শুক্রবার সকাল থেকেইিএকটি নতুন বিষয় আলোচনায় আসে। নুসরাতের ঘনিষ্ঠমহল সূত্রে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো জানায়, অভিনেতা যশ দাশগুপ্ত এবং নুসরাতের জীবনে আসতে চলেছে নতুন অতিথি। একমাস আগেই এই সুখবর পেয়েছেন তারা।

শুরু হয় আবারও নতুন আলোচনা, নতুন বিতর্ক। ওদিকে নিখিল জানান, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। ওর সঙ্গে দীর্ঘদিন আমার কোনো সম্পর্ক নেই। এই সন্তান আমার নয়।

ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো জানায়, গত কয়েক মাস ধরেই নুসরাতের সংসার নেই। আইনিভাবে বিচ্ছেদ না হলেও দুজন আর একসঙ্গে থাকেন না। এই ফাঁকে অভিনেতা যশের সঙ্গে জমে উঠেছে নুসরাতের প্রেম। তাদের সেই প্রেমও গোপন থাকেনি।

এসব বিষয় নিয়ে যখন টালিউড ও মিডিয়াপাড়াসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক তুঙ্গে তখনই এক বিস্ফোরক বিবৃতি প্রকাশ করেন নুসরাত। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার সূত্রে জানা যায়, ওই বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, তিনি নিখিল জৈনের সঙ্গে লিভ-টুগেদার করেছেন, তাকে বিয়ে করেননি। এজন্য তার সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের কোনো প্রশ্নই উঠে না।

তিনি আরও বলেন, তুরস্কের বিবাহ আইন অনুযায়ী ওই অনুষ্ঠানের কোনও বৈধতা নেই। যেহেতু এটা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিয়ে, তাই ভারতে স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্টে রেজিস্ট্রেশনের প্রয়োজন ছিল, সেটাও করা হয়নি। আইনের চোখে এটা বিয়েই নয়।

নুসরাত বলেন, নিখিলের সঙ্গে আমি সহবাস করেছি, বিয়ে নয়। তবে বহুদিন ধরে আমরা বিচ্ছিন্ন। কিন্তু আমি ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রকাশ্যে বলতে চাইনি।

নুসরাত ও যশ দাশ গুপ্ত

ঘটনা এখানেই শেষ নয়, এরপর আইনজীবির মাধ্যমে নিখিলও পাল্টা বিবৃতি প্রকাশ করে নুসরাতের জবাব দেন। নুসরাত তার বিবৃতিতে নিখিলের প্রতি অভিযোগ এনেছিলেন যে, তার পরিবার নুসরাতের টাকা ও গয়না অবৈধভাবে আটকে রেখেছে। নিখিলও এর পাল্টা জবাবে বলেছেন, নুসরাতের কাছে আরও পাওয়ানা আছে ইত্যাদি ইত্যাদি।

যাই হোক, ঘটনা এতটুকুতেই যে শেষ হবার নয় তা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে। এই জল গড়াবে আরও বহুদূর। তবে ভাববার বিষয় হলো, নুসরাত-নিখিল-যশের এই জলে বাঙালি জাতির সামাজিকতা, নৈতিকতা ও সমাজ-সভ্যতা ভেসে যাবে না তো! কেননা, তাদের মাধ্যমে আমরা যা দেখছি তা তো আসলে আমাদের সমাজ, আমাদের দেশ, এমন কি তাদের দেশ ও ধর্ম কারও কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়। নুসরাত নিজেই বলেছে, তাদের বিয়ে বৈধ হয়নি।

তাদের বিয়ের বৈধতা নিয়ে এর আগেও অনেকে প্রশ্ন তুলেছিলেন। অনেকেই বলেছিলেন এটি একটি অবৈধ বিয়ে। কেননা বিয়েটি যে দেশে হয়েছে, সেটি একটি মুসলিম দেশে। আর ইসলামে ভিন্নধর্মের কাউকে বিয়ে করাটা বৈধ নয়। তাদের দেশ ভারতেও এই বিয়ে বৈধ হয়নি যা নুসরাতই বলেছে।শুধু ইসলাম কেন, পৃথিবীর এমন কোনও ধর্ম নেই যে ধর্ম অন্যকোন ধর্মের কাউকে বিয়ে করার বৈধতা দিয়েছে। এসব কথা এর আগে; যখন তাদের বিয়ে করার খবর প্রকাশ হয়েছিলো তখন অনেকেই বলেছিলেন। কিন্তু কেউ কানে নেইনি। বলেছে উদারতা; বর্তমান দুনিয়ায় নাকি উদারতার অভাব। তাই তারা সব নিয়ম-নীতি ভেঙে উদার হয়েছেন।

তবে শেষ পর্যন্ত এসে কী দেখা গেলো? শুনুন নুসরাতের মুখেই। একটু আগেই উল্লেখ করা হয়েছিলো, ‘‘নুসরাত বলেন, নিখিলের সঙ্গে আমি সহবাস করেছি, বিয়ে নয়।’

এই তাদের উদারতার চিহ্ন? সোজা বাংলায় আমাদের দেশ ও সমাজে এবং ধর্মে এটাকে ব্যাভিচার বা জিনা বলা। এমন সম্পর্ক দুই বাংলার কোন সমাজেই গ্রহণযোগ্য নয়। গ্রহণযোগ্য নয় খোদ নুসরাত-নিখিল বা যশের অনুসরণ করা কোন ধর্মেই। তারপরও তারা এমন সম্পর্ক নিয়ে গর্ব করে মিডিয়ায় কথা বলছে। ভয় হয়, তাদের এসব আচরণের কারণে দুই বাংলার সভ্য সমাজব্যবস্থাটাই আবার ভেঙে যায় কিনা!

তাদের এই সম্পর্ক বা বিবাহহীন সহবাসকে তারা নাম দিয়ে থাকে লিভ ইন রিলেশন বা লিভ টুগেদার। পশ্চিমাদের আবিস্কৃত নাম ও সংস্কৃতি এটি। সিনেমা ও সিনেমার অভিনেতা-অভিনেত্রীরা আমাদের সমাজে এটির আমদানিকারক। দুঃখের বিষয় হলো, তাদের প্রভাবে এই বিষ আমাদের সমাজে এখন আর বিরল কিছু নয়। বিশেষ করে আধুনিকতার ধ্বজাধারী তথাকথিত প্রগতিশীল, যারা দেশি-বিদেশি সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের দ্বারা প্রভাবিত, তারা এই বিষে বিষাক্ত।

অথচ সমাজবিদরা বলছেন, এ ধরণের সম্পর্ক বা লিভ টুগেদার যে আশায় করা হয়ে থাকে তা মূলত নিরাশাই থেকে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, পশ্চিমারা পারিবারিক বন্ধন বা সামাজিক দায়িত্ব অস্বীকার করে নির্ভার ও বাধাবন্ধনহীন সুখানুভবে জীবন কাটাতে। ক্যারিয়ারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার ফলে দাম্পত্যজীবনকে তারা এড়িয়ে চলে। সবকিছু শুধু অর্থের মানদণ্ডে দেখা এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যনির্ভর ভোগবাদী জীবনব্যবস্থা এবং আত্মকেন্দ্রিক ধ্যানধারণা থেকেই এই লিভ টুগেদারের উৎপত্তি। ইউরোপ আমেরিকায় দায়িত্ব নিতে অনীহার কারণে নারী-পুরুষের বিয়ে ব্যবস্থা দিন দিন ভেঙে যাচ্ছে। এরই পরিণতিতে বিচ্ছিন্ন পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে ওদিকের দেশগুলোতে।

সামাজিক দায়িত্ব অস্বীকারের মধ্যে একটি হচ্ছে সন্তানের দায়িত্ব অস্বীকার করা। এজন্য অনেকেই বিয়ে করলেও সন্তান নেয় না নিজের ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব হবে। এর কারণে আরও একটি বড় সমস্যায় নিপতীত হচ্ছে এমন সম্পর্ককে বৈধতা দেয়া দেশগুলো। সেটি হচ্ছে, জনসংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। বিষয়টি একটু বিস্তারিত বললে এর ভয়াবহতা আরও ভালভাবে বুঝে আসবে।

পাশ্চাত্যের বহু দেশে জনসংখ্যা ক্রমশ কমতে শুরু করেছে এবং উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। জাতিসঙ্ঘের ২০১৭ সালের এ সংক্রান্ত রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ক্রমাগত জনসংখ্যা কমছে বিশ্বে এমন দেশের সংখ্যা ৫১টি। অনেক দেশে ৫০-৬০ বছর ধরে জনসংখ্যা বাড়েনি বরং কমেছে। ২০৫০ সালের মধ্যে অনেক দেশের জনসংখ্যা এক-তৃতীয়াংশ কমে যাবে। জনসংখ্যার ক্রমহ্রাসমান এই প্রবণতাকে অনেকে ‘ডেমোগ্রাফিক টাইমবোম্ব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যদি জন্মহার বাড়ানো না যায় এবং বিদেশীদেরও গ্রহণ না করা হয়, তাহলে এক সময় কোনো কোনো দেশ জনশূন্য হয়ে যাবে- এমন আশঙ্কা করছেন অনেকে। হারিয়ে যেতে পারে অনেক শ্বেতাঙ্গ জাতিগোষ্ঠী। আর তা চলতি শতাব্দীর মধ্যেই হতে পারে বলে ওই রিপোর্টে
বলা হয়েছে।

কয়েক দশক ধরে জন্মহার না বাড়ার কারণে ইতোমধ্যে বুলগেরিয়া, স্পেন, জাপান ও ইউরোপের প্রায় সব দেশের অনেক গ্রাম জনশূন্য হয়ে পড়েছে। বুলগেরিয়া, স্পেন ও জাপানের অনেক গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার, যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে মানুষ না থাকায়। অনেক বাড়িঘর পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে। বিবিসি, রয়টার্স, গার্ডিয়ানসহ বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যম ছাড়াও সংশ্লিষ্ট দেশের গণমাধ্যমে এ বিষয়ে সরেজমিন প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়েছে। বুলগেরিয়ার কোনো কোনো পাড়া ও গ্রামে মাত্র ২৫/৩০ জন বাসিন্দা আছেন, যেগুলো একসময় ছিল কোলাহলমুখর।

বলা হয়ে থাকে, কোনো দেশের জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে সংশ্লিষ্ট দেশের প্রত্যেক নারীর গড়ে ২ দশমিক ১০ শতাংশ করে সন্তান থাকা প্রয়োজন। সেখানে ইউরোপে এ হার গড়ে ১ দশমিক ৫৫। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ আরো অনেক দেশেও এ হার একই। বিশ্বে দ্রুত জনসংখ্যা কমছে- এমন শীর্ষ ১০টি দেশের তালিকা রয়েছে জাতিসঙ্ঘসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে। এর সবগুলো দেশই পূর্ব ইউরোপের। এসব দেশে একজন নারীর গড়ে সন্তান রয়েছে ১ দশমিক ৩ জন। স্পেনে এ হার ১ দশমিক ২।

জনবহুল যেসব দেশে সবচেয়ে নিম্ন জন্মহার, সেগুলো হলো- চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, রাশিয়া ফেডারেশন, জাপান ও ভিয়েতনাম। ১০ বছর আগে একজন মার্কিন নারীর গড়ে ২ দশমিক ১টি সন্তান ছিল। এখন তা কমে ১ দশমিক ৭৭টি। একে ‘ঐতিহাসিক পতন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে বোস্টন গ্লোব পত্রিকা।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৪০ সালের মধ্যে চীন হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি। দ্বিতীয় স্থানে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র, তৃতীয় ভারত আর চতুর্থ ইন্দোনেশিয়া। বর্তমানে পিছিয়ে থাকা আরো কয়েকটি জনবহুল দেশ সামনের কাতারে চলে আসবে নতুন শক্তি হিসেবে। দেশগুলোর এ অবস্থানের পেছনে ভূমিকা থাকবে ওই সব দেশের জনসংখ্যার।

সবশেষে বলতে চাই, লিভ টুগেদার-লিভ ইনরিলেশন বা বিয়ে ছাড়াই সহবাস; আপনি যে নামেই তাকে ডাকেন না কেন, এই ভ্রষ্ট জীবনাচারের কারণে আমাদের সমাজ ও ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসংঙ্গ বিয়ে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ভেঙে পড়ছে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জাতি মানবসমাজের অস্তিত্যের এক বড় উপাদান, সুন্দরতম আদর্শ সংসারজীবন। পরিণতি একে তো সমাজে দিন দিন বাড়ছে অস্থিরতা, অপরদিকে ধেঁয়ে আসছে এক মহাবিপদ।

সিনেমাপাড়ায় প্রায়ই সংসার ভাঙার সংবাদ শোনা যায়। আমরা বলতে চাই এটা বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। বরং এটা তাদের কর্মফল। আজ পর্যন্ত একটা নজিরও নেই যে, লিভ টুগেদার করে সুখে-শান্তিতে কেউ জীবন পার করেছে।

তাই আসুন এখনই নিজের জীবনের গতিপথ ঠিক করে নিই। নিজের সন্তান ও সঙ্গী-সহকর্মীদেররও এসব বিষয়ে সতর্ক করি। মনে রাখবেন, সবাই মিলে একত্রে চেষ্টা না করলে হয়তো একদিন আপনার-আমার ঘরে বা আপনার-আমার মধ্যেই মরণ থাবা বসিয়ে দেবে পাশ্চাত্যের এই মানবসভ্যতার মরণব্যাধী।

এফটিপি/কাজী হামদুল্লাহ

পূর্ববর্তী নিবন্ধএকসাথে এতো মসজিদের উদ্বোধন বিশ্বে বিরল
পরবর্তী নিবন্ধআবারও আলোচনায় রেলমন্ত্রীর বিয়ে

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে